ঢাকার দুই সিটির ২৬টি খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার। যার কোনো কোনোটিতে অল্প পানির দেখা মেলে আবার কোনোটি শুধুই আবর্জনা আর বসতবাড়ির দখলে রয়েছে। বর্জ্য ফেলায় বিষাক্ত হয়ে পড়ছে অনেক খালের পানি, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে হুমকি। রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা শহরের খালের অবস্থাও নাজুক। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খাল-ড্রেন সংস্কার ও নির্মাণে পরিকল্পনার অভাবে অর্থের অপচয় হয়েছে। আর শুধু সাময়িক দখলমুক্ত নয়, দেখভালে চাই নিয়মিত তদারকি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সবচেয়ে বড় খাল মান্ডা খাল। ২০২২ সালে মান্ডাসহ ঢাকার ৪টি খাল সংস্কারে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় ডিএসসিসি। এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মান্ডা খালের চিত্র যে এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি তার প্রমাণ মেলে খালের মধ্যে শিশুদের ফুটবল খেলা দেখলে।
রাজধানীতে খেলার মাঠ কমছে, তাই খেলা গড়িয়েছে বর্জ্যরে স্তূপের মাঠে। আকাশ, তুহিন, হামিম, সাদিকুল, জিহাদের মতো সুখনগরের অন্য অনেক শিশুদের খেলার মাঠ এটি। কিন্তু একটু ছুটতেই যে মাঠে ঢেউ খেলে সেটি কি আসলেই মাঠ?
বর্জ্যরে এই মাঠটি আসলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মান্ডা খাল। যদিও দেখে বোঝার উপায় নেই। আর এই শিশুরাও জানে না তারা কোনো মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে ফুটবল খেলছে। একবার এই বর্জ্যরে ভাগাড়ে দেবে গেলে বাঁচার আশা শূন্য। যেমন হয়েছিল ২০১৭ সালে শিশু হৃদয়ের বেলায়। বর্জ্যরে তলায় ডুবে মৃত্যুর ৬ দিন পরে তার মরদেহের সন্ধান মিলে ছিল।
মান্ডা খালের মতোই ডিএসসিসি‘র শ্যামপুর, জিরানী, কালুনগর, কদমতলীসহ অন্যান্য খালের চিত্র। নামে খাল হলেও এর কোনো কোনোটিতে পানির দেখা মেলে আবারও কোনোটি শুধুই আবর্জনা আর বসতবাড়ির দখলে।
স্থানীয় একজন বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, এখানে পরিষ্কার, সুন্দর পানি ছিল। এখানে আমরা সাঁতার কাটছি। আমাদের মা-বোনরা কলস দিয়ে এখানকার পানি উঠিয়েছে।
অন্য একজন স্থানীয় বলেন, সবাই এর ভেতর ময়লা ফেলে। ময়লা দূরে নিতে সমস্যা মনে হয় বলে আমি নিজেও এখানে ময়লা ফেলি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) খালের চিত্রও ভিন্ন নয়। এই যেমন আফতাবনগরের মধ্য দিয়ে একসময়ের প্রবাহমান খাল সুতিভোলার নাম আজ ভুলতে বসেছে নগরবাসী। প্রায় একই অবস্থা রূপনগর খালের হলেও এখনও ধুঁকে ধুঁকে পানি প্রবাহিত হয় কল্যাণপুর খালে। তাহলে সিটি করপোরেশন বছর বছর খাল দখলমুক্ত করতে যে বরাদ্দ দেয় তা কোন কাজে ব্যবহৃত হয়?
ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, একটি খাল পরিষ্কার করতে অনেক টাকা প্রয়োজন। বিগত ৫০ বছর ধরে ময়লা ফেলতে ফেলতে ময়লার ভাগাড় হয়েছে এই খালগুলো। বর্তমানে খাল ব্যবহার হয় ময়লার ভাগাড় হিসেবে, আমাদের পয়ঃবর্জ্য ফেলার জন্য।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা ২৬টি খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার। যদিও কোথাও কোথাও এসব খাল বক্স কালভার্টে পরিণত হয়েছে। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, খালগুলোকে বক্স কালভার্টে পরিণত করা একটি অপরাধ।
রাজধানীর কোথাও কোথাও খাল বক্স কালভার্টে রূপ নিলেও শনির আখরার খালটি এখনও বক্স কালভার্টে রূপ নেয়নি। তবে খালের ওপরে লোহার পাত ফেলে সেখানে দোকান বসানো হয়েছে। ফলে চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই খালটি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে তারা খাল উদ্ধারে কাজ করছে। সেখানে কীভাবে সিটি করপোরেশনের চোখের সামনে এভাবে একটি খাল উধাও হয়ে যেতে পারে?
২০২০ সালে খালের দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন খাল দখলমুক্ত, সীমানা নির্ধারণ এবং সৌন্দর্য বর্ধনে তিন ধাপে কাজ শুরু করে। সংস্থাটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১২৫ কোটি আর খাল ও কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় ধরে ১০ কোটি টাকা। এছাড়া ডিএসসিসি ৪টি খাল সংস্কারে ৮৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়। কিন্তু হাতে পাওয়ার সাড়ে তিন বছর পরেও তাহলে খালের চিত্র এমন কেনো? কবে শেষ হবে খালের কাজ?
ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, খালগুলোর অর্ধেকের ওপর আমাদের সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে। আমরা এখন সূচি অনুযায়ী পরিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আর বাকি প্রকল্প নিয়ে আমরা মূল নকশা করে দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু করবো।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ১৯৮০ সালের দিকে ঢাকায় ৬০টি খালের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৮ এর দিকে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৫০টিতে। কিন্তু ২০১৭ সালে সরকার গঠিত টাস্কফোর্স খাল খুঁজে পায় ৩৮টি। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসার অধীনে ছিল ২৬। যা ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে ওয়াসা। বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা আরও ১৪টি খাল ঢাকা দক্ষিণ সিটিকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি। এর বাইরে ঢাকার বাদবাকি খালের আর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সরকারি নথিপত্র থেকে কীভাবে হারিয়ে গেলো এসব খাল?
পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকার যদি বলে যে আগে ৫০টি খাল ছিল, এখন ৩৮টি আছে আর বাকি ১২টি হারিয়ে গেছে। তাহলে বাকি ১২টি কীভাবে হারিয়ে গেলো সরকার সে জবাব দিচ্ছে না। সরকারই হয়তো সেগুলো কোনো প্রকল্প গড়ে তুলেছে, হয়তো কালভার্ট দিয়ে ঢেকে ফেলেছে। প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুতার সাথে যারা আছেন, তারা এগুলো দখল করেছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, বেআইনি ভবন উচ্ছেদ করার জন্য যে অর্থ খরচ হয় তা ওই ভবনের মালিকের কাছে থেকে নেয়ার কথা। কতটুকু ভবন অপসারণ করতে হবে, কতটুকু জায়গা থেকে উৎখাত করতে হবে সবকিছু হিসাব করেই প্রকল্পে নামার কথা। সে যদি প্রকল্পে নামার পর বলে যে আমি এই সমস্যাটি দেখেছি। তাহলে তাদের দায়ী করা উচিত।
বর্তমানে নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ২১টি খালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। খাল ও নালা পরিষ্কারে সংস্থাটি প্রতিবছর ব্যয় করে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা। এত ব্যয়ের পরেও একদিকে নগরী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক খাল। অন্যদিকে, নগরীর খালগুলো মরে যাওয়ার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই শহরে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। যদিও পানি উঠে পুরো নগরীতে কী পরিমাণ সহায়-সম্পদের ক্ষতি হয় তার হিসাব নেই কারও কাছে। ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় ১০ বছরে ২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে শুধু খাতুনগঞ্জে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ঢাকার খাল কাগজে আছে, বাস্তবে নেই
সংস্কার-তদারকির অভাবে অধিকাংশই খাল মৃতপ্রায়
- আপলোড সময় : ০২-০৭-২০২৪ ০৪:৪৫:৫৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০২-০৭-২০২৪ ০৪:৪৫:৫৭ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ